গত কয়েক দিনে পাবনায় যে অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটেছে তার জন্য প্রশাসন কতটা দায়ী ঘটনার সূত্রপাত ঘটিয়েছেন ক্ষমতাসীন দল ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীরা
তাঁরা প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের বদলির দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশও করেছেন
সে সম্পর্কে সংস্থাপনবিষয়ক উপদেষ্টা কিছু বলেননি
তবে নাগরিক সমাজের সঙ্গে জেলা প্রশাসনের মতবিনিময় সভা আহ্বান আচরণবিধির লঙ্ঘন বলে জানিয়েছেন তিনি
এ ছাড়া তাঁদের করারই বা কী ছিল আচরণবিধিটি আক্ষরিক অর্থে না দেখে একজন অভিজ্ঞ সাবেক আমলা হিসেবে উপদেষ্টা সেখানকার কর্মকর্তারা কী পরিস্থিতিতে কাজটি  করেছেন তা আমলে নিতে পারতেন
সরকারি কর্মকর্তাদের অবশ্যই সরকারি আইনকানুন মেনে কাজ করতে হবে
সেখানে দায়িত্বরত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ থাকলে তদন্তের পরই ব্যবস্থা নেওয়া যেত
কিন্তু তার আগেই সরকার তাঁদের সরিয়ে দেওয়ায় সারা দেশেই প্রশাসনিক কর্মকর্তারা তটস্থ থাকবেন
ভবিষ্যতে কেউ ক্ষমতাসীন দল বা তাদের সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মীদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভয় পাবেন
সে ধরনের পরিস্থিতি কি আইনের শাসনের সহায়ক হবে
জনপ্রশাসন চলবে আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী
প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যাতে নির্বিঘ্নে ও নির্ভয়ে দায়িত্ব পালন করতে পারেন তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের
পাবনায় সন্ত্রাসী ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপকে সবাই স্বাগত জানিয়েছে
এটি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও দলীয় সন্ত্রাস দমনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারত
কিন্তু আক্রমণকারী ও আক্রান্তের প্রতি সরকারের সম-দৃষ্টিভঙ্গি কারও জন্য কল্যাণ বয়ে আনবে না
সরকারদলীয় নেতা-কর্মীদের সঙ্গে বিরোধের কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা যদি এভাবে বদলি বা হয়রানির শিকার হন তাহলে জনপ্রশাসনে শৃঙ্খলা ভেঙে পড়তে বাধ্য
এ দৃষ্টিভঙ্গি অগ্রহণযোগ্য
সংবাদমাধ্যমের ওপর দোষ চাপানো
প্রধানমন্ত্রীর সংস্থাপনবিষয়ক উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম পাবনার ঘটনায় সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে অতিরঞ্জনের যে অভিযোগ তুলেছেন তা সঠিক নয়
সেখানে প্রশাসনের আক্রান্ত ব্যক্তিরা সুধী সমাবেশে নিজেদের অসহায় অবস্থা তুলে ধরতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন এবং তাঁদের কেউ কেউ কান্নায় রুদ্ধকণ্ঠ হয়েছিলেন
সংবাদপত্রে ছবি ছাপা হয়েছে বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে চলমান চিত্র প্রচারিত হয়েছে
জেলা প্রশাসকের বরাত দিয়ে উপদেষ্টা বলেছেন কর্মকর্তাদের কান্নার কোনো ঘটনা ঘটেনি
কিন্তু সংবাদমাধ্যমের ছবিগুলো তো মিথ্যা নয় অতিরঞ্জিতও নয়
দুঃখজনকভাবে ক্ষমতাসীনদের মধ্যে এমন প্রবণতা লক্ষ করা যায় তাঁদের জন্য বিব্রতকর কোনো ঘটনার বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ জনসমক্ষে প্রকাশিত ও প্রচারিত হলে তাঁরা বিব্রত না হয়ে বরং আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠেন সংবাদমাধ্যমের বিরুদ্ধে মিথ্যাচার বা অতিরঞ্জনের অভিযোগ তোলেন
আমরা দেখেছি বিগত চারদলীয় জোটের শাসনামলে জঙ্গি বাংলা ভাই ও তাঁর জেএমবি সম্পর্কে প্রথম আলো যখন ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশ করছিল তখন তৎকালীন সরকারের মন্ত্রীরা বলেছিলেন বাংলা ভাই জেএমবি এসবের অস্তিত্ব নেই মিডিয়ার সৃষ্টি
কিন্তু অচিরেই প্রমাণিত হয়েছিল বাংলা ভাই জেএমবি ও তাদের সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা—কোনো কিছুই সংবাদমাধ্যমের বানোয়াট বিষয় ছিল না
সংবাদমাধ্যম নিজেদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছে
১৭ সেপ্টেম্বর পাবনায় দুটি পরীক্ষাকেন্দ্রে হামলার ঘটনা বেসরকারি সংবাদমাধ্যমের কল্যাণেই জনসাধারণ জানতে পেরেছে
তার পর থেকে জেলা প্রশাসকসহ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাবনা থেকে প্রত্যাহার পর্যন্ত সব ঘটনাই জনসাধারণকে অবহিত করেছে সংবাদমাধ্যম
রাষ্ট্রীয় বেতার-টিভি এ বিষয়ে কী দায়িত্ব পালন করেছে তা জনসাধারণ দেখেছে
এখন যদি সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয় যে এসব খবর প্রকাশ করার ফলে প্রশাসন ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে তাহলে সংবাদমাধ্যমের কী করার থাকতে পারে সন্ত্রাস বা অপরাধের সংবাদ প্রকাশ করলে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয় না বরং এসব যারা ঘটায় তাদের কারণেই ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়ে থাকে
পরীক্ষাকেন্দ্রে ভাঙচুর প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ধাওয়া ও লাঞ্ছিত করা থেকে শুরু করে সুধী সমাবেশ ডেকে প্রশাসনের কর্মকর্তাদের আবেগঘন দৃশ্যায়ন এগুলোও সংবাদমাধ্যম তথা সাংবাদিকেরা ঘটাননি
তাই সংবাদমাধ্যমের ওপর দোষ না চাপিয়ে সরকারের উচিত হবে ঘটনার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া
প্রশাসন
দলীয়করণ ও যোগ্যতা-অযোগ্যতার প্রশ্ন
গত ২০ সেপ্টেম্বর একটি কর্মসূচি উদ্বোধনকালে প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্যবিষয়ক উপদেষ্টা সৈয়দ মোদাচ্ছের আলী ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিকে ১৩ হাজার ৩৫০টি পদে দলীয় লোক নিয়োগ দেওয়া হবে সূচক সূত্র প্রথম আলো ও অন্যান্য জাতীয় পত্রিকা বক্তব্য দিয়ে বিতর্কের অবতারণা করেছেন
সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে এর ফলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতির কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি মেধার ভিত্তিতে লোক নিয়োগ করা হবে হালকা হয়ে গেছে
উপদেষ্টা পরে প্রথম আলোর ২৪ সেপ্টেম্বর ইস্যুতে একটি বার্তায় বলেন তাঁর বক্তব্য গণমাধ্যম ভুলভাবে প্রচার করেছে আবার তার পিঠাপিঠি পত্রিকাটি তাঁর ধারণকৃত ভাষ্য ছাপিয়ে দিয়ে জানিয়ে দিয়েছে আসলে তিনি কী বলেছেন
আবার ২৭ সেপ্টেম্বর প্রথম আলোয় রিপোর্ট দেখলাম স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী মজিবুর রহমান ফকির উপদেষ্টা সাহেবের বক্তব্যকে সমর্থন করে কোথাও যেন ভাষণ দিয়েছেন
আমরা বিষয়টি আলোচনায় আনছি এ জন্য নয় যে উপদেষ্টা বনাম গণমাধ্যমের মধ্যকার বিরোধের মধ্যে আমরা কোনো আলোচনার বীজ খুঁজে পেয়েছি কিন্তু এ জন্য যে দলীয় লোক নিয়োগ ও যোগ্যতা-অযোগ্যতার প্রশ্নটি জাতীয়ভাবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় এবং এর বিভিন্ন পরিপ্রেক্ষিত আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানে যাচাই করার লক্ষ্যে আমি আলোচনাটির অবতারণা করছি
অর্থাৎ উপদেষ্টা বনাম গণমাধ্যমের বিতর্কে অংশ নিচ্ছি না কিন্তু প্রাসঙ্গিক বিষয়টি নিয়ে আলোচনায় নামতে চাই
ফিদেল কাস্ত্রোর যে একটি উপদেশ বঙ্গবন্ধু গ্রহণ করেননি কিন্তু করলে ভালো করতেন সেটি ছিল রাষ্ট্রের সব গুরুত্বপূর্ণ পদে যেন মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেওয়া লোকদের নিয়োগ দেওয়া হয়
তাঁর বক্তব্য ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের রাষ্ট্র পরিচালনায় অভিজ্ঞতা কম থাকলেও মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের স্পিরিট ও দেশপ্রেমের টানে তাঁরা অভিজ্ঞতার খামতিটা পুষিয়ে নিতে পারবেন
অন্যদিকে পাকিস্তান থেকে ফেরত আসা বাঙালি সিভিল এবং মিলিটারি অফিসাররা তাঁদের চিরাচরিত ব্যক্তিস্বার্থ রক্ষার্থে কাজ করবেন দেশের জন্য কাজ করবেন না
কাস্ত্রোর এই উপদেশ পরবর্তী সময়ে অমোঘ সত্যরূপে প্রতিভাত হয়
সূত্র অ্যান্টনি ম্যাসকারেনহাস বাংলাদেশ আ লিগাসি অব ব্লাড
কাস্ত্রোর এ চিন্তার আলোকে দেশ পরিচালনায় একটি রাজনৈতিক সরকারের কাঠামোতে দলীয় লোক নিয়োগের প্রশ্নটি একেবারে অবান্তর নয়
বস্তুত নীতিনির্ধারণী পদগুলোতে লোক নিয়োগের সময় সরকারের পক্ষে দলীয় লোক নিয়োগ দেওয়ার রেওয়াজ খোদ যুক্তরাষ্ট্র থেকে শুরু করে ভারতে পর্যন্ত বিদ্যমান
স্বাভাবিক কারণে বাংলাদেশও তার ব্যতিক্রম নয়
এ প্রবণতার একটি বাস্তব যুক্তি হলো দলীয় লোক বা দলীয় আদর্শের সমর্থক নন কিন্তু খুবই যোগ্য লোক তাঁকে উঁচু পদে বসিয়ে রাজনৈতিক সরকারের পক্ষে কাজ চালানো সম্ভব নয়
কারণ শাসনব্যবস্থার উপরিভাগে সবকিছুর ওপর প্রয়োজন পড়ে ট্রাস্ট বা আস্থা
নেতার প্রতি দলের প্রতি ও আদর্শের প্রতি
ব্রিটেনের রানি প্রথম এলিজাবেথ যে তাঁর সম্ভাব্য প্রেমিক রাজসভার দেদীপ্যমান সদস্য আর্ল অব এসেক্সকে গিলোটিন করেছিলেন তার পেছনে মন্ত্রণা ছিল রানির একান্ত বিশ্বাসযোগ্য অমাত্য মুখ্য সচিব স্যার রবার্ট সেসিলের
কথিত আছে এ সেসিলকে রানি একবার রেগে গিয়ে রাজসভায় প্রকাশ্যে চড় মেরেছিলেন কিন্তু তাতেও সেসিলের আনুগত্য এতটুকুও টাল খায়নি
রবার্ট সেসিল ও তাঁর বাবা ব্যারন উইলিয়াম সেসিল এবং তাঁর আগের মুখ্য সচিব স্যার ফ্যান্সিস ওয়ালশিংগাম ছিলেন ইংরেজ আমলাতন্ত্রের পুরোধা রাজ্য পরিচালনায় রানিকে/রাজাকে সঠিক পরামর্শ দেওয়ার যেমন তাঁদের ছিল অপরিসীম দক্ষতা তেমনি তাঁদের পেশাগত জীবনের সাফল্যের ভিত্তি ছিল নৃপতির প্রতি শর্তহীন আনুগত্য
সূত্র গ্রাহাম হোল্ডারনেস শেকসপিয়ার দ্য হিস্ট্রিজ
বর্তমান যুগেও সেসিল-ধরনের আনুগত্য যে দেখা যায় না তা নয় কিন্তু আমাদের আলোচনার জোরটি পড়ছে আনুগত্য ও যোগ্যতার সম্পর্ক নির্ধারণে
কাস্ত্রোর কথায় আবার ফিরে আসি
তিনি আনুগত্যের কথা বলেছিলেন তাও যোগ্যতার কথা স্বীকার করে নিয়ে
মুক্তিযোদ্ধাদের ছিল সরাসরি মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের অভ্রান্ত যোগ্যতা
মুক্তিযোদ্ধারা রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে সদ্য অর্জিত স্বাধীনতাকে যে পরিপুষ্টি দিতে পারতেন সেটি তো অন্যদের পক্ষে সম্ভব ছিল না
এটি হয়নি বলে দেশ ষড়যন্ত্রের পর ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছে ক্ষয় হয়েছে একের পর এক মুক্তিযোদ্ধার
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে ছাত্ররাজনীতি নিয়ে বিশেষ করে ছাত্রলীগের রাজনীতি নিয়ে বিপাকে পড়ে
ছাত্রলীগ ও যুবলীগের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিরামহীন সন্ত্রাস চাঁদাবাজি টেন্ডারবাজি দখলিস্বত্বসহ বিভিন্ন আইনবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে ত্যক্তবিরক্ত হয়ে প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং ছাত্রলীগের সাংগঠনিক প্রধানের পদ থেকে ইস্তফা দেন
তার পরও ছাত্রলীগ ও যুবলীগের দৌরাত্ম্য হ্রাস না পেলে বলা হয় আওয়ামী লীগের সঙ্গে ছাত্রলীগ বা যুবলীগের আর সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা থাকবে না
বস্তুত পাবনার সাম্প্রতিক ঘটনায়—যেখানে তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারী নিয়োগ পরীক্ষায় হামলা হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের বিরোধ তৈরি হয়েছে সেখানে দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা তৈরি করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম গেলে তাঁকে যখন জানানো হয় যে হামলাকারীরা ছিল সরকারদলীয় বিভিন্ন সংগঠনের তখন তিনি জানান যুবলীগ ও ছাত্রলীগ আর আওয়ামী লীগের অংশ নয় তারা গন্ডগোল করে থাকলে সে দায়িত্ব সরকার নেবে না
কিন্তু বাস্তব প্রেক্ষাপট হলো সম্পূর্ণ ভিন্ন
আওয়ামী লীগ বা একই কারণে বিএনপি চাইতে পারে না যে ছাত্রলীগ বা যুবলীগ বা ছাত্রদল বা যুবদল তাদের থেকে সম্পূর্ণ বিযুক্ত থাক
এটা তারা সরকারিভাবে বললেও বাস্তবে সেটা কার্যকর হবে না
কারণ ইয়ুথ টিম না থাকলে যেমন জাতীয় ক্রিকেট বা ফুটবল টিম তৈরি হতে পারে না সে রকম ছাত্র ও যুবক থেকে কর্মী উঠে না এলে বড় দল সংগঠিত হতে পারে না
এ জন্যই এডাল্ট দলগুলোর ইয়ুথ দলের দরকার হয়
এ প্রয়োজনটা আওয়ামী লীগের জন্য বা বিএনপির জন্য একটি অতিশয় বাস্তব প্রয়োজন
রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দলগুলোর কাঠামোগত দর্শন যদি আমরা কিছুমাত্র বুঝতে পারি তাহলে বুঝতে পারব কেন হাজার হাত শক্তিশালী হয়েও সরকারি দল আওয়ামী লীগের পক্ষে ছাত্রলীগ বা যুবলীগকে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না
আসলে সম্ভব হচ্ছে না তা নয় বাস্তব কারণে তা চাওয়াও হচ্ছে না
কেন তার কারণ দলীয় রাজনীতির একটি শক্তিশালী খুঁটি হচ্ছে জনসমর্থন আর আরেকটি খুঁটি হচ্ছে আধিপত্যবাদ
সমর্থন বলতে বোঝায় যেমন ভোট পাওয়া কোনো ইস্যুতে নাগরিকদের সমর্থন পাওয়া গণমাধ্যমের সমর্থন ইত্যাদি
কিন্তু আধিপত্যবাদে সমর্থনটা জোর করে আদায় করা হয়
অথবা সমর্থন আদায় করতে না পারলে জোর করে আধিপত্য বজায় রাখার ব্যবস্থা করা হয়
সরকারি দলের পক্ষে পুলিশ বাহিনীসহ অন্যান্য আইন নিয়ন্ত্রণী সংস্থা আছে যাদের দিয়ে সরকার সমাজ ও রাষ্ট্রের নানা রকম শৃঙ্খলা বজায় রাখে
কিন্তু গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক সমাজে শুধু পুলিশ বা আনসার দিয়ে কর্তৃত্ব বা আধিপত্য বজায় রাখা যায় না
জনগণ ও গণমাধ্যমের নির্মাংসল সমর্থন দিয়েও কর্তৃত্ব বা আধিপত্য বজায় রাখা যায় না এ কর্তৃত্ব বজায় রাখতে দরকার হয় আধিপত্যবাদী শক্তি
এ আধিপত্যবোধ রাজনৈতিক চেতনার বহু গভীর শিকড় থেকে প্রস্রবিত হয় যার প্রধান উৎস অর্থনৈতিক
কারণ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত দলের আধিপত্য বজায় রাখার জন্য পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখতে হয়
এ পুরস্কারের ব্যবস্থা যেমন রাস্তায় থাকতে হবে তেমনি থাকতে হবে সেতুর ওপর টোল গ্রহণের মাধ্যমে তেমনি থাকতে হবে গরুর হাটে চামড়ার বাজারে বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়নকাজে বাসের ডেরায় রেলস্টেশনে আড়তে বাজারে মাছঘাটে টেন্ডারে কেব্ল ও ভিডিওর বাজারে এমনকি পাড়ার সুন্দরী মেয়েদের ওপর
এসব ক্ষেত্রে পেশির ভূমিকা ব্যাপক
এ পেশি সরবরাহ করে বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ এবং স্কুল ও পাড়ার দলীয় তরুণ ও যুবকেরা
এ পেশিশক্তিকে সন্তুষ্ট রাখতে ক্ষমতাধারী দলকে নানা রকম পুরস্কারের ব্যবস্থা রাখতে হয়
সে জন্য সরকারি দল বা বিরোধী দল নিজেদের যুবশক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না বা চায় না
সরকারি দলের মনে ভয় থাকে যদি এ তরুণ-যুবক শ্রেণীকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয় তাহলে বিরোধী দলগুলোর তরুণ ও যুবক সংগঠনগুলো সে অঞ্চলগুলো দখল করে নেবে
দখল করে নিলে বণ্টনকৃত পুরস্কারের ব্যবস্থা থাকবে না তখন আধিপত্য খর্ব হবে
আধিপত্যবোধের এ চেতনা থেকে উপদেষ্টা সাহেব সম্ভবত মুখ ফসকে বলে ফেলেছেন সব কমিউনিটি ক্লিনিকের পদ দলীয় লোকদের মধ্যে বণ্টন করা হবে
নিরেট বাস্তবতা
কিন্তু ওইভাবে বলাটা কৌশলী বলা হয়নি
আর যোগ্যতা পেশির নিছক যোগ্যতা পেশিই
তবে আমার একটা প্রিয় রচনা আছে তপনকুমার রায়চৌধুরী প্রণীত সেকাল ও একাল যেটার বহু উল্লেখ আমি বহু কলামে করেছি এবং প্রাসঙ্গিক বিধায় আজও করছি
তিনি কংগ্রেসের স্বাধীনতালগ্নের রাজনীতির সঙ্গে বর্তমান কালের কংগ্রেসের রাজনীতির প্রভেদ দেখাতে গিয়ে বলেছিলেন তখন কংগ্রেস এবং মুসলিম লীগও একটা পদ্ধতিতে কর্মী জোগাড় করত
কংগ্রেসের কয়েকটা ছোট ছোট সেল বা বিশেষ দল ছিল যাদের কাজ ছিল সারা ভারত চষে মেধাবী গুণবান গুণবতী সচ্চরিত্রের তরুণ সদস্য-সদস্যা সংগ্রহ করা
কিন্তু কংগ্রেসের সে ধারা রক্ষিত হয়নি এবং রায়চৌধুরীর মন্তব্য স্মরণ থেকে লিখছি এখন ভারতীয় সংসদে এমন অনেক সদস্য আছেন যাঁরা সংসদে না বসে জেলে থাকার যোগ্য
আধুনিক রাজনৈতিক সমাজ বহু পরস্পরবিরোধী বিপরীত চক্রে আবর্তিত একটি জটিল প্রক্রিয়া তাই দলীয়করণের সঙ্গে যোগ্যতা অযোগ্যতার সম্পর্কটি সরলীকরণভাবে দেখার উপায় নেই
মোহীত উল আলম অধ্যাপক ও বিভাগীয়প্রধান ইংরেজি ও মানববিদ্যা বিভাগ ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ
